পাহারাদারই যখন জল্লাদ : হাকালুকির হাওরে অতিথি পাখি ধরতে বিষটোপ!

Published: 2018-02-13 03:15:54    Updated : 2018-02-13 13:37:33

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি : হাকালুকি হাওরে ঝাঁকে ঝাঁকে অতিথি পাখি নিধন হচ্ছে। পাখি ধরতে ব্যবহার করা হচ্ছে বিষটোপ। হাওর দেখাশুনার জন্য নিযুক্ত পাহারাদাররা রাতে অতিথি পাখির বিচরণস্থলে বিষ মেশানো খাদ্য ছিটিয়ে রেখে কাছাকাছি পাড়ে লুকিয়ে থাকেন। এরপর বিষাক্ত খাদ্য খেয়ে পাখিগুলো অসুস্থ হয়ে ঢলে পড়লে সেগুলো ধরে তারা সিলেট ও মৌলভীবাজার শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করেন। পাহারাদারদের সঙ্গে আঁতাত করে একইভাবে পাখি নিধন করেন পেশাদার শিকারিরাও। শুধু বিষটোপ নয়; জাল ও বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ পেতেও পাখি নিধন হচ্ছে। পেশাদার শিকারি ছাড়া সৌখিন শিকারিরাও বন্দুক দিয়ে অতিথি পাখি নিধন করছেন। এতে একদিকে জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ফসলি জমিতে ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ বাড়ছে।

মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার ৫টি উপজেলাজুড়ে হাকালুকি হাওরের বিস্তার। এটি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম হাওর। ৪৮ হাজার হেক্টরের এ হাওরে ২৩৮টি বিল ও ১০টি নদী রয়েছে। এখানে প্রতি বছর শীতের শুরুতে সাইবেরিয়া ও হিমালয়ের পাদদেশ লাদাক থেকে ৫০-৬০ প্রজাতির লাখো অতিথি পাখি নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে আসে। এসব ভিনদেশি বিচিত্র রঙের পাখি দেখার জন্য পর্যটকরাও ছুটে আসেন এ হাওরে। অতিথি পাখিরা এ হাওরের চকিয়া, কাংলি, গোবরকুড়ি, গৌড়কুড়ি, জল্লা, হাওরখাল, পিংলা, কালাপানি, মালাম, বাইয়াগজুয়া, নাগুয়ালরীবাই, ফুটবিল ও কৈয়াকোনা বিলেই সাধারণত আশ্রয় নেয়। তাই এ বিলগুলো শীতের দিনগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই হাজারো পর্যটকে মুখর থাকে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পেশাদার ও সৌখিন পাখিশিকারিদের কারণে হাকালুকি হাওর অতিথি পাখির জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘সিএনআরএস’ হাওরের বিভিন্ন বিলের পাখি, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় হাওরপাড়ের বাসিন্দাদের নিয়ে বিভিন্ন সমিতি গঠন করে দিয়েছে। এসব সমিতি কিছু ব্যক্তিকে হাওরের পাহারদার নিযুক্ত করেছে। অভিযোগ আছে, এসব পাহারাদাররাই অবাধে অতিথি পাখি শিকার করছেন। এছাড়া তাদের সঙ্গে আঁতাত করে পেশাদার ও সৌখিন শিকারিরা বিষটোপসহ নানা ফাঁদ পেতে পাখি নিধন করেন। হাওরপাড়ের বাসিন্দারা জানান, নিরাপদ বিচরণের অভাব ও শিকারিদের উৎপাত বাড়ায় অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার হাওরে পাখি কম এসেছে।

হাওরের বোরো চাষি আবদুল হালিম জানান, পেশাদার পাখি শিকারিরা দিনে গরু-মহিষ ও হাঁস চড়ানোর নামে বিষটোপ ফেলে পাখি ধরে। পরে সুযোগ বুঝে এসব পাখি বস্তায় ভরে নিয়ে যায়। পাহারাদারদের ‘ম্যানেজ’ করে রাতেও তারা এ কাজ করে। অনেকে দিনের বেলায় পাহারাদারের অস্থায়ী বাসায় অবস্থান নেয়। পরে রাতে জাল দিয়ে ফাঁদ পেতে পাখি শিকার করে ভোর হওয়ার আগেই হাওর ত্যাগ করে।

সরকারের অভয়াশ্রম ঘোষিত পলোভাঙ্গা বিলের পাড়ে একটি অস্থায়ী ঘর রয়েছে। সম্প্রতি এ ঘরে গিয়ে দেখা যায়, ২০-২৫ জন লোক থাকার জিনিসপত্র রয়েছে এখানে। এ ঘরের বাইরে বড় একটি হাঁড়িতে এক ব্যক্তি ভাত রান্না করছেন। নুরুল ইসলাম নামের ওই ব্যক্তি নিজেকে সিএনআরএসের পাহারাদার বলে দাবি করেন। তিনি আরও জানান, অন্য লোকজন বিলের অপর পাড়ে রয়েছেন। এ ঘরের পাশেই বেশ কিছু অতিথি পাখির ডানা ও পশম পড়ে থাকতে দেখা যায়। এ নিয়ে প্রশ্ন করলে নুরুল ইসলাম বলেন, ’১০-১২ দিন আগে একটি বক শিকার করেছিলাম। সে পাখির পশম পড়ে আছে।’

কুলাউড়া উপজেলায় হাকালুকি হাওর রক্ষায় নিয়োজিত ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ইকোসিস্টেম অ্যান্ড লাইভলিহুডস (ক্রেল) প্রকল্পের ফিল্ড অর্গানাইজার মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘হাকালুকি হাওরের একটি অংশ কুলাউড়ায় পড়েছে, এটাই আমার সাইট। এবার আমার সাইটে কড়া নজর রাখছি। এখানে বিষটোপ বা বন্দুক দিয়ে কোনও অতিথি পাখি শিকার হয় না। তবে বড়লেখা এলাকায় কিছু পাখি শিকার হলেও হতে পারে।’

ক্রেল প্রকল্পের এনআরএম ফ্যাসিলেটর মো. সিকান্দর আলী মুঠোফোনে  বলেন, হাকালুকি হাওরের দুই শতাধিক বিলের মধ্যে  ৫টি মাছের অভায়শ্রম। সেগুলো আমরা দেখাশুনা করি। মাছের এই অভায়শ্রমগুলো পাহারা দেন সিএনআরএসের পাহারাদাররাও।’ পলভাঙ্গা বিল, টুলার বিল, বাইয়া বিল, কৈয়ার কোনা বিল, পায়া গজুয়া বিলে অতিথি পাখি আসে না বলে দাবি করেন। তবে বড়লেখার ইসলামপুরের বাসিন্দারা পাখি নিধন করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

কুলাউড়ার উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. সুলতান মাহমদ স্থানীয় মৎস্যজীবী বরাত দিয়ে  বলেন, ‘সিএনআরএসের পাহারাদারসহ স্থানীয়দের বিরুদ্ধে অতিথি পাখি নিধনের অভিযোগ পেয়েছি। এদের কারণে অতিথি পাখি আর আগের মতো আসে না। আগে ৫০-৬০ প্রজাতির পাখি আসলেও এবার বড়জোর ৩০-৪০ প্রজাতির পাখি এসেছে। এভাবে চলতে থাকলে হাওর একসময় পাখিশূন্য হয়ে পড়বে। পাখি শিকার বন্ধ করা না গেলে চরম হুমকিতে পড়বে হাওরের জীববৈচিত্র্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরের পদক্ষেপ এবং জনসচেতনতা জরুরি।’ পাখিশিকারি চক্রকে ধরিয়ে দিতে সবার এগিয়ে আসা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।

বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ সুহেল মাহমুদ বলেন, ‘শুনেছি, সিএনআরএসের পাহারাদারদের মদদে শিকারিরা অতিথি পাখি শিকার করে। হাকালুকি হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আমাদের সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। কোনোভাবেই অতিথি পাখি নিধন করা যাবে না। পাখিশিকারিদের ধরা গেলে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে শাস্তি দেওয়া হবে।

শেয়ার করুন

Print Friendly and PDF

আপনার মতামত দিন

সর্বশেষ খবর

  •    জগন্নাথপুর থেকে ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী আটক
  •    সিলেটে ওয়াকফের জমি দখলমুক্ত করলো উপজেলা প্রশাসন
  •    সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে শহীদ আরেফের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে হবে : লোকমান আহমদ
  •    সুনামগঞ্জ-৫ আসনের এমপি প্রার্থী জাহাঙ্গীর গ্রেফতার
  •    হযরত শাহপরান (র.) উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদত্যাগের দাবি
  •    হাওলাদারপাড়া সমাজকল্যাণ যুব সংঘের নয়া কমিটি
  •    নগরীতে ফেন্সিডিল ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী আটক
  •    বিশ্বনাথে বখাটের যন্ত্রনায় কলেজ ছাত্রীর আত্মহত্যা : ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন
  •    ওসমানী মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের পূর্নাঙ্গ কমিটি অনুমোদন
  •    মঙ্গলবার সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপির বিক্ষোভ কর্মসূচি
  •    কানাইঘাটে জাহানারা খুনের দায়ে ৩ জনকে আসামী করে মামলা
  •    তানিম ও মিয়াদের হত্যাকারীদের শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন
  •    গোলাপগঞ্জে অস্ত্রসহ ৫ ডাকাত আটক
  •    গোলাপগঞ্জে ৩ দিন আটকে যুবতীকে ধর্ষণ, আটক ১
  •    সাংবাদিকদের জন্য শিথিল হচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন
  • সাম্প্রতিক পরিবেশ খবর

  •   বাইক্কাবিলে দেখা মিলছে ৩৮ প্রজাতির ৫ হাজার ৪১৮ পাখির
  •   কোম্পানীগঞ্জে টাস্কফোর্সের অভিযান : ১০টি বোমা মেশিন ধ্বংস
  •   সিলেটের বিভিন্ন এলাকার নাম জানান দিচ্ছে বিলুপ্ত দিঘি
  •   বিছনাকান্দিতে পাথর শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় ৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা
  •   সিলেটের পর্যটন এলাকার সরকারি জমিতে পাথরখেকোদের থাবা
  •   সিলেট সিটি কর্পোরেশনের আবর্জনা উন্মুক্ত ভাবে ফেলার প্রতিবাদ
  •   জাফলংয়ে স্কুলের মাঠ দখল করে পাথর ষ্টক, চলছে ক্রাশার মেশিন!
  •   এবার লোভাছড়ায় অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনে ‘সর্বদলীয় জোট’
  •   আলমপুরে হুমকির মুখে সুরমা ডাইক : আতংকে এলাকাবাসী
  •   বালাগঞ্জে কুশিয়ারার ভাঙ্গনে নিঃস্ব অর্ধ শতাধিক পরিবার
  •   জৈন্তাপুরের আসামপাড়ায় দু’পক্ষের সংঘর্ষ : নিহত ১, আসামপাড়ায় ১৪৪ ধারা জারি
  •   বড়লেখায় চলছে টিলার কাটার মহাউৎসব
  •   জৈন্তাপুরে ১৪৫ একর জমিতে পাথর উত্তোলনে আদালতের নিষেধাজ্ঞা
  •   সিসিকের অভিযান : দীর্ঘ এক যুগ পর দখলমুক্ত হচ্ছে সুরমার তীর
  •   রাতারগুলে ভূমি ১৩১ একর ভূমি উদ্ধার করলো বনবিভাগ