ওসমানীনগর থানা পুলিশের টার্গেট বাণিজ্য : নিরিহ মানুষকে হয়রানী

Published: 2018-02-15 02:44:04

প্রতীকী ছবি

জায়ামাত বিএনপির সাথে সখ্যতা

নিজস্ব প্রতিবেদক : ওসমানীনগরে থানা পুলিশের আটক বাণিজ্যে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে খোদ আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকেরাও রেহাই পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ ওঠেছে। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার রায়কে কেন্দ্র করে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানের নামে থানা পুলিশের আটক বাণিজ্য এখন তুঙ্গে। বিষয়টি এখন থানা পুলিশের মধ্যে উৎসবের আমেজে পরিণত হয়েছে। প্রতি রাতে বাড়ি-বাড়ি গিয়ে তল্লাশী করে ঘুমন্ত সাধারণ মানুষকে হয়রাণী করা এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন যাকে খুশি ধরবে, আর অর্থ আদায় করবে। আবার চাহিদামত অর্থ না দিলে ফিটিং মামলায় জেলে দেয়াই পুলিশের টার্গেট এমন মন্তব্য ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের। পুলিশের এ কর্মকান্ডে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেছেন এলাকার সচেতন মহল। তবে, উপজেলার সর্বত্রই এখন পুলিশের আটক বাণিজ্যে আতংক বিরাজ করলেও থানা পুলিশের সাথে আঁতাতের মাধ্যমে এখানকার জামাত-বিএনপির সক্রিয় নেতাকর্মীরা গ্রেফতার এড়িয়ে অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে তারা পার পেয়ে যাচ্ছেন।

১১ ফেব্রুয়ারী দিনগত রাতে উপজেলার উছমানপুর ইউনিয়নের একটি গ্রামের নির্দলীয় এক ব্যক্তিকে ঘর থেকে ডেকে বের করে ভ্যানে উঠায় পুলিশ। তখন নির্দলীয় ওই ব্যক্তি পুলিশকে বলেন- আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত নই। ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকে ফোন দিলে আমার কথার সত্যতা পাবেন। পুলিশ টিমের নেতৃত্বে থাকা ওসমানীনগর থানার পুলিশ কর্মকর্তা ওই সময় ইউনিয়ন চেয়ারম্যানকে কল না দিয়ে ওই ইউনিয়নের বিএনপির এক দায়িত্বশীল নেতার মোবাইলে কল করেন। পুলিশ কর্মকর্তা বিএনপির নেতার সাথে টাকার অঙ্ক ধার্য্য করে ওই নির্দলীয় ব্যক্তিকে ছেড়ে দেন।

সূত্রমতে, ৫ ফেব্রুয়ারী খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত সিলেট সফর এবং ৮ ফেব্রুয়ারী জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়কে কেন্দ্র করে ওসমানীনগর থানায় একটি পুলিশ এসল্ট ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে আরো একটি মামলা দায়ের করা হয়। বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় কৌশলে জামায়াত-বিএনপির নেতাদের নাম বাদ দিয়ে উপজেলা কৃষক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক আহমদের ছোট ভাই নিজ করনসী গ্রামের বাসিন্দা মুনির আহমদ মনির, দয়ামীর ইউনিয়নের শরিষপুর প্রকাশিত দৌলতপুর গ্রামের মৃত নওয়াব আলীর ছেলে আওয়ামী লীগ কর্মী দিনমজুর কামাল আহমদ ও একই ইউনিয়নের সুমন মিয়া নামের ছাত্রলীগ কর্মী অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে কামাল আহমদকে বিশেষ ক্ষমতা আইনে দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাকে আদালতে চালান দেয়া হয়েছে। এছাড়া ওই মামলায় আওয়ামী ঘরানার আরো অনেককেই অভিযুক্ত করায় বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগ মহলে পুলিশের ভুমিকা নিয়ে ওঠেছে।

প্রসঙ্গত-দয়ামীর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফারুক মিয়া স্বাক্ষরিত ২০১০ সালের ১ জানুয়ারী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সদস্য ফরমে (ক্রমিক নং-২৫৮৬১) বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় আটক কামাল আহমদকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সদস্য অন্তর্ভুক্ত করেন। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আতাউর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক আফজালুর রহমান চৌধুরী নাজলু যৌথ স্বাক্ষরিত কামালকে আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে প্রত্যয়নপত্র দেন।

আওয়ামী লীগ কর্মী কামাল আহমদকে হয়রানীমূলক মামলায় আটকের ঘটনায় কামালের মাতা এলাচুন নেছা বাদি হয়ে গত ১৩ ফেব্রুয়ারী সিলেটের ডিআইজিসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিকট লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এছাড়া পুলিশের এমন কর্মকান্ডে অতিষ্ট হয়ে ভুক্তভোগী আরো অনেকেই জেলা পুলিশের উর্দ্ধতন কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেয়ার প্রস্ততি নিচ্ছেন বলে তারা জানিয়েছেন।

কামালের মায়ের দাখিল করা লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে- সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় আওয়ামী লীগ সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থাকলেও সরকারের সকল অর্জনকে ম্লান করে দিতে জামায়াত-বিএনপির সাথে আঁতাতের মাধ্যমে ওসমানীনগর থানার বর্তমান অফিসার ইনচার্জ মো. সহিদ উল্যাহসহ অন্যান্য অফিসাররা নিরীহ-নিরপরাধ মানুষকে সরকার বিরোধী ও হয়রানীমূলক মামলায় জড়িয়ে আটক বাণিজ্যে মেতে ওঠেছেন।

থানা পুলিশ জামায়াত-বিএনপির নেতাদের কালো টাকায় প্রভাবিত হয়ে আওয়ামী লীগ কর্মী কামাল আহমদকে মামলা দিয়ে হয়রানী করা হচ্ছে। মামলায় নাম জড়ানোর পর স্থানীয় ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ কামাল আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে অফিসার ইনচার্জ মো. সহিদ উল্যার কাছে প্রত্যয়নপত্রও দেন।

প্রত্যয়নপত্র পেয়ে ওসি আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের কাছে দু:খ প্রকাশ করে বলেন, কামাল আওয়ামী লীগের কর্মী বিষয়টি আমার জানা ছিল না, তবে, পরবর্তীতে তার বিষষটি আমি বিবেচনা করবো। কিন্তু ওসির কাছে প্রত্যয়নপত্র দেয়ার পরও ১০ ফেব্রুয়ারী বিকেলে থানার এসআই শেখ রকিবুল ইসলাম কামালকে নিজ বাড়ি থেকে আটক করেন।

আটকের পর আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ এসআই রকিবুলের সাথে যোগাযোগ করা হলে কামালকে ছেড়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। এছাড়া কামালকে ছেড়ে দেয়ার কথা বলে থানার আরেক এসআই ফরিদ আহমেদ কামালের এক নিকট আত্মীয়ের কাছ থেকে দুই হাজার টাকা উৎকোচ নেন। ওই দিন সন্ধ্যায় কামালের মাতা বৃদ্ধা এলাচুন নেছা তার আরেক ছেলে জাবলু মিয়াকে সাথে নিয়ে থানায় গিয়ে এসআই রকিবুলের সাথে দেখা করেন। কামালকে ছেড়ে দিতে তার মায়ের কাছে ওসির দোহাই দিয়ে বড় অঙ্কের টাকা দাবি করেন এসআই রকিবুল। কিন্তু দাবিকৃত টাকা না দেয়ায় পরদিন ১১ ফেব্রুয়ারী কামালকে আদালতে চালান দেয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলার প্রবীণ আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেন, থানার বর্তমান ওসি টাকার বিনময়ে জায়ামাত বিএনপিকে রাজপথে সরকার বিরোধি কর্মসূচি পালন করার সুযোগ দিচ্ছেন। বিষয়টি এমন হয়ে দাঁড়িয়ে যে, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের ভাবমূর্তি  ক্ষুন্ন করতে ওসমানীনগর থানায় বর্তমান কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তারা যেন উঠে পরে লেগেছেন। থানা পুলিশ উপজেলা বিএনপি নেতাদের কালো টাকায় প্রভাবিত হয়ে নিরিহ মানুষসহ সরকারদলীয় নেতা-কর্মীদের বিভিন্ন মাধ্যমে হয়রানী করে যাচ্ছে। এমনি ওসমানীনগর থানার কনস্টেবল থেকে শুরু করে অফিসার ইনচার্জ পর্যন্ত টার্গেট বাণিজ্যে চালিয়ে যাচ্ছেন। কেউ এসবের প্রতিবাদ করলে তাকে জেল জুলুম ও মামলায় জড়ানোর হুমকি প্রদান করা হচ্ছে।

এবিষয়ে দয়ামীর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফারুক মিয়া বলেন, থানা পুলিশ কৌশলে এলাকার জামায়াত-বিএনপির সক্রিয় কর্মীদেরকে শেল্টার দিচ্ছে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদেরকে টার্গেট করে আটক বাণিজ্য করছে। পুলিশের সরকার বিরোধী মামলায় আমার ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ কর্মী কামাল ও ছাত্রলীগ কর্মী সুমনসহ একাধিক নেতাকর্মীকে জড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে কামালকে আটক করে জেলে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের এসব বিতর্কিত কর্মকান্ডে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হওয়ার সামিল।

উপজেলা কৃষকলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক আহমদ বলেন, সরকার বিরোধীদের সাথে ওসমানীনগর থানা পুলিশের গভীর সখ্যতা রয়েছে। তাদেরকে না ধরে পুলিশ উল্টো সাধারণ মানুষসহ সরকার দলীয় অনেককেই হয়রানী করে আসছে। পুলিশের একটি মামলায় আমার ছোট ভাইকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে। এবিষয়ে আমি পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষন করছি।

উপজেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগের আহবায়ক চঞ্চল পাল বলেন, পুলিশের দায়েরকৃত মামলায় সাধারণ মানুষ যেনো হয়রানী না হয় সে বিষয়টি নিয়ে থানার অফিসার ইনচার্জের সাথে আলোচনা করেছি।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আফজালুর রহমান চৌধুরী নাজলু বলেন, পুলিশের দায়ের করা মামলায় জামায়াত-বিএনপির অনেকের নাম বাদ দিয়ে নিরীহ মানুষসহ সরকার দলীয় লোকজনের নাম জড়ানো এবং সাঁড়াশি অভিযানের নামে নিরীহ লোকজনকে হয়রানীর অভিযোগ আমাদের কাছে অহরহ আসছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় আলোচনা করেছি।

ওসমানীনগর থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ সহিদ উল্যা বলেন, বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলার এজহারটি তাৎক্ষনিক প্রস্তুত করা হয়েছে। মামলাটির তদন্ত চলছে, এজাহারনামীয়দের মধ্যে  কেউ ঘটনার সাথে জড়িত না থাকার সত্যতা পাওয়া গেলে তাকে মামলার অভিযোগপত্র থেকে অব্যাহতি দেয়া হবে। সরকার বিরোধী কর্মসূচিতে কতিপয় রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার প্রমান পাওয়া গেলেও তাদের নাম এই মামলায় অন্তর্ভুক্তি করার সুযোগ রয়েছে। তবে তল্লাশীর নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানীসহ অভিযোগগুলি অস্বীকার করেন তিনি।

শেয়ার করুন

Print Friendly and PDF

আপনার মতামত দিন

সর্বশেষ খবর

  •    জামালগঞ্জে ইজারাদারের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ
  •    সাংবাদিক লুৎফুরের সুস্থতা কামনায় দোয়া মাহফিল
  •    আফগানিস্তান সিরিজের দলে বালাগঞ্জের রাহী
  •    হবিগঞ্জে দুই পক্ষের সংঘর্ষ : শিশুসহ আহত অর্ধশতাধিক, আটক ১৩
  •    মাধবপুরে শিশু খুন
  •    চুনারুঘাটে গাঁজাসহ গ্রেপ্তার ২
  •    নগরীতে নকল ঘি’র কারখানাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা
  •    সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ধান সংগ্রহ শুরু হয়নি এখনও
  •    নবীগঞ্জে দায়সারা কাজ, বাঁধের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
  •    মহানবী (সা.)-কে কটুক্তি, মসজিদে তালা দেওয়ার প্রতিবাদে মানববন্ধন
  •    ছাতকে ফাইল বন্দি কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ
  •    এবার ফুলকলিকে ৭০ হাজার টাকা জরিমানা
  •    কন্ঠশিল্পী হিমাংশু বিশ্বাস অসুস্থ, উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় প্রেরণ
  •    আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার ১৪ বছর আজ
  •    ছাত্রদল নেতা সাজ্জাদের কারামুক্তি, জেলগেইটে সংবর্ধনা
  • সাম্প্রতিক সিলেট খবর

  •   জামালগঞ্জে ইজারাদারের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ
  •   হবিগঞ্জে দুই পক্ষের সংঘর্ষ : শিশুসহ আহত অর্ধশতাধিক, আটক ১৩
  •   মাধবপুরে শিশু খুন
  •   চুনারুঘাটে গাঁজাসহ গ্রেপ্তার ২
  •   নগরীতে নকল ঘি’র কারখানাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা
  •   সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ধান সংগ্রহ শুরু হয়নি এখনও
  •   নবীগঞ্জে দায়সারা কাজ, বাঁধের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
  •   মহানবী (সা.)-কে কটুক্তি, মসজিদে তালা দেওয়ার প্রতিবাদে মানববন্ধন
  •   ছাতকে ফাইল বন্দি কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ
  •   এবার ফুলকলিকে ৭০ হাজার টাকা জরিমানা
  •   কন্ঠশিল্পী হিমাংশু বিশ্বাস অসুস্থ, উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় প্রেরণ
  •   ছাত্রদল নেতা সাজ্জাদের কারামুক্তি, জেলগেইটে সংবর্ধনা
  •   সিলেট সরকারি কলেজের সামন থেকে ইয়াবা ও গাঁজাসহ আটক ২
  •   বালাগঞ্জে এবারও রমজানে পণ্যের দাম চড়া
  •   নগরীতে দুই ঘন্টার অভিযানে ৩২ মাদকসেবীকে কারাদন্ড